পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ৩৫ বস্তা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার
ঢাকা টুডে ২৪ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৪৭ এএম
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ৩৫ বস্তা টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে আবারও সৃষ্টি হয়েছে দানের এক অনন্য নজির। দীর্ঘ ৩ মাস ২৭ দিন পর শনিবার সকালে মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খোলা হলে পাওয়া গেছে রেকর্ড ৩৫ বস্তা নগদ টাকা, সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার। এখন চলছে টাকার গণনার কাজ। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার দানের মোট পরিমাণ ১৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়বে।
শনিবার সকাল ৭টা ১০ মিনিটে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. কামরুল হাসান মারুফসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
দানবাক্স খোলার পর প্রথমে সিন্দুক থেকে টাকা বের করে বস্তায় ভরা হয়। পরে সেগুলো মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে গণনার কাজ শুরু করা হয়। এই বিশাল কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা, মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট দানবাক্স খোলা হলে পাওয়া গিয়েছিল ৩২ বস্তা টাকা। সেবার গণনা শেষে পাওয়া যায় এক অভাবনীয় অঙ্ক—১২ কোটি ৯ লাখ ৩৭ হাজার ২২০ টাকা, যা সে সময় দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। এবার বস্তার সংখ্যা ও দানের পরিমাণ দেখে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবে বর্তমান দান।
জানা গেছে, সাধারণত প্রতি তিন মাস অন্তর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হলেও দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এবার সময়সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়। তবুও প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই মসজিদে এসে দান করে যাচ্ছেন। দানকারীদের বিশ্বাস, এখানে দান করলে তাদের মনের আশা পূরণ হয়। এই বিশ্বাসই দিন দিন দানের পরিমাণকে নিয়ে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়।
পাগলা মসজিদ ঘিরে রয়েছে প্রায় আড়াইশ বছরেরও বেশি পুরোনো জনশ্রুতি ও ইতিহাস। কথিত আছে, এক সময় নরসুন্দা নদীর বুকে জেগে ওঠা একটি উঁচু টিলায় বসবাস করতেন এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধক। তার আস্তানায় মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ যাতায়াত করতেন। সাধকের ইন্তেকালের পর সেই স্থানটিই পরিণত হয় ‘কামেল পাগল পীরের মসজিদ’-এ, যা পরবর্তীতে পরিচিতি পায় পাগলা মসজিদ নামে। মানত ও দানে মনোবাসনা পূরণ হয়—এই বিশ্বাস থেকেই আজও বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম। প্রথমে মাত্র ১০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে ওঠা এই মসজিদ এখন বিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩ একর ৮৮ শতাংশ জায়গাজুড়ে। এর আয় ও খ্যাতির কারণে এটি এখন দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত এবং এর নামকরণ করা হয়েছে পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্স।
মসজিদের দান থেকে প্রাপ্ত অর্থ শুধু মসজিদের উন্নয়নেই নয়, বরং জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজেও ব্যয় করা হয়। করোনাকালেও এই দানের অর্থ থেকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককে অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে এখানে একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে অর্ধলাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন এবং আলাদাভাবে ৫ হাজার নারীর নামাজের ব্যবস্থাও থাকবে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নকশা ও ডিজাইন চূড়ান্ত করলেই দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।
রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ টাকা গণনা করতে সারাদিন সময় লেগে যেতে পারে। সন্ধ্যা বা তার পর মোট টাকার পরিমাণ জানা যাবে। তবে সব মিলিয়ে এটুকু নিশ্চিত—পাগলা মসজিদে দানের এই ঢেউ আবারও প্রমাণ করল, বিশ্বাস আর আস্থার শক্তিতে কীভাবে সৃষ্টি হতে পারে নতুন নতুন ইতিহাস।
